ইমিগ্রেশন ও ভিসা
বিভিন্ন কারণে আমাদের বিদেশ গমনের প্রয়োজন হতে পারে। আমাদের বিদেশ গমনের প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে আমাদেরকে সংশ্লিষ্ট ক্যাটাগরীর ভিসার জন্য আবেদন করতে হয়। আমরা যেসব ক্যাটাগরীর আওতায় বিদেশ ভ্রমনের ভিসার জন্য আবেদন করে থাকি সেগুলো নিচে দেওয়া হল:১। উচ্চ শিক্ষা (Higher Studies)
- নিজ খরচে পড়ার জন্য
- স্কলারশীপের মাধ্যমে পড়ার জন্য
- সরকারী ও পেশাগত
- বেসরকারী ও পেশাগত
- আত্মীয় স্পন্সর
- প্রাতিষ্ঠানিক আমন্ত্রণ
- নিজস্ব বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান
- যৌথ কারবার
উপরোক্ত যে উদ্দেশ্যেই বিদেশ যাওয়া হোক না কেন, বিদেশ গমনেচ্ছু ব্যাক্তিদের কিছু বিষয়াবলী সম্পর্কে পূর্বেই স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন। যেমন:
- বিদেশ গমনেচ্ছু ব্যক্তির অবশ্যই অন্তত: ১ বৎসর মেয়াদ রয়েছে এরকম পাসপোর্ট থাকতে হবে।
- আগহী ব্যক্তি যে দেশে যেতে ইচ্ছুক নিকটতম দূরত্বে অবস্থিত সে দেশের দূতাবাস থেকে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে ভিসা গ্রহণ করতে হবে।
- সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের বেশ কিছু পূর্বশর্ত পূরণ সাপেক্ষে ভিসার আবেদন করতে হয়।
- ভিসা পাবার যোগ্যতা প্রমানের জন্য আগ্রহী প্রার্থীকে দূতাবাসের ভিসা অফিসারের সামনে সাক্ষৎকার দিতে হয়। এই সাক্ষাৎকারের সময় কৌশলগত অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়।
- প্রাথমিক নির্বাচনের পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে ডাকযোগে, ফ্যাক্সের মাধ্যমে অথবা ই-মেইলে যোগাযোগ করতে হবে।
ভিসার শ্রেণীবিভাগ (Immigration Visa)
- ইমিগ্রেশন ভিসা
- ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ভ্রমন ভিসা
- স্টুডেন্ট ভিসা
- চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগ ভিসা
- ভিজিটর ভিসা
বিদেশ গমনের জন্য ইমিগ্রেশন ভিসাই শ্রেষ্ঠ ও স্থায়ী পদ্ধতি; আর এ কারনেই পদ্ধতিটি বেশ জটিল ও সময় সাপেক্ষ। যেসব দেশে ইমিগ্রেশনের জন্য সরাসরি আবেদন করা যায় তাদের মধ্যে কানাডা, আষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইটালী ও আমেরিকা অন্যতম। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে এসব দেশে ভিসার জন্য সরাসরি আবেদন করা যেতে পারে। এসব আবেদনপত্র সংশ্লিষ্ট দেশের ইমিগ্রেশন বিভাগ স্থানীয় হাইকমিশন বা দূতাবাসে যাচাই বাচাই শেষে নির্বাচিত হলে দূতাবাসে তাদের সাক্ষাৎকারের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সন্তোষজনক সাক্ষাৎকারের প্রেক্ষিতে প্রার্থীকে বিস্তারিত ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ করতে বলা হয়। সবশেষে প্রার্থীর মেডিক্যাল এক্সামিনেশন করা হয়; এতে ফলাফল অনুকূল হলে তাকে সংশ্লিষ্ট দেশে স্থায়ী বসবাসের (Permanent residency) সুযোগ করে দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় প্রার্থী শুধু নিজেই নয় বরং পুরো পরিবারকে নিয়ে বিদেশ পাড়ি দিতে পারেন। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে ১-২ বছর সময় লেগে যেতে পারে।
ইমিগ্রেশন ভিসার জন্য যে কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয় সেগুলো নিম্নরূপ:
- প্রাথমিক আবেদন
- প্রাথমিক ভাবে নির্বাচিত হলে নির্ধারিত ফি প্রদানপূর্বক বিস্তারিত আবেদন।
- সাক্ষাৎকার (সাধারণত ১০-১২ মাস পরে
- সাক্ষাৎকার সন্তোষজনক হলে মেডিক্যাল রিপোর্ট, পাসপোর্টসহ ইমিগ্রেশন ফি জমা দিতে হয়।
- কাগজপত্রে কোন ভুল ধরা না পড়লে দূতাবাস গ্রীন সিগনাল দেবে প্রার্থী প্রার্থীকে। প্রার্থী তখন এয়ার টিকেট বুকিং দিয়ে বিদেশ যাত্রার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারেন।
- বিদেশে পৌঁছানোর ৩-৬ মাস পর প্রার্থী পোষ্যদের জন্য স্পন্সর করতে পারেন।
সাক্ষাৎকার পর্ব
দূতাবাসের ইমিগ্রেশন অফিসারের সাথে সাক্ষাৎকার পর্ব ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। প্রার্থীকে মনে রাখতে হবে একজন ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে সর্বময় ক্ষমতা দেয়া থাকে। ইনি যেসব বিষয়ের উপর ভিত্তি করে প্রার্থীর যোগ্যতা নিরূপন করেন সে বিষয়গুলোতে প্রার্থীকে অবশ্যই সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। ইমিগ্রেশণ অফিসারের সাথে সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে কিছু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিচে দেয়া হলো:
- শালীনতাপূর্ণ মার্জিত পোষাক পরতে হবে। চুল, দাঁড়ির ছাঁট রুচিসম্মতভাবে হতে হবে। চোখের চাহনী এবং অভিব্যক্তিতে আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে।
- স্বাভাবিক স্বতস্ফুর্ত ভদ্রোচিত আচরন করতে হবে। যেমন: হাসিমুখে গুড মর্নিং বা গুড আফটারনুন বলে কথা শুরু করতে হবে।
- ইংরেজী ভাষায় শুদ্ধভাবে ও সংক্ষিপ্ত আকারে কথোপকথন চালাতে হবে। প্রশ্নদাতার কোন প্রশ্ন না বুঝতে পারলে সবিনয়ে বলতে হবে। pardon me বা excuse me, Would you please repeat the question? এর মানে হচ্ছে আমি আপনার প্রশ্নটি বুঝিনি, আপনিকি দয়া করে পুনরায় বলবেন। প্রশ্নের উত্তর স্পস্ট ও যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত হওয়াই বাঞ্চনীয়। মনে রাখতে হবে প্রশ্নটি না বুঝে কখনোই ভুল উত্তর দেয়া যাবে না। প্রশ্নকর্তার accent বুঝতে সমস্যা হলে বলতে হবে Would you please say that again? এটাই বিদেশী রেওয়াজ এবং প্রশ্নের সাথে Would you please বলে অনুরোধ করা এবং অনুরোধ মানলে Thank you বলে কৃতজ্ঞতা জানানো বাঞ্চনীয়।
- প্রশ্নকর্তা বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে প্রার্থীর মানসিক দৃঢ়তা সম্পর্ক নিশ্চিত হতে চাইবেন। তাই তিনি যে ধরনের প্রশ্নই করুন না কেন কোন অবস্থাতেই উত্তেজিত হওয়া চলবে না, বরং ঠান্ডা মাথায় হাসিমুখে তার প্রশ্নের যৌক্তিক উত্তর দিতে হবে। আর সর্বদাই আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। আর কখনোই এমন মনোভাব প্রদর্শন করা যাবে না যে আপনি তাদের অনুকম্প প্রার্থনা করছেন বরং আপনার কথাবার্তায় যেন তাদের মনে হয় যে এই ব্যাক্তিটি তাদের দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সহায়ক হবে। শুধু সেক্ষেত্রেই আপনি সফলভাবে সাক্ষাৎকার পর্বে উত্তীর্ণ হতে পারেন।
- চাহিবা মাত্র যেন কর্তৃপক্ষকে যে কোন ধরনের কাগজপত্র প্রদর্শন করতে পারেন এজন্য আগে থেকেই প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র, ফিস ইত্যাদি গুছিয়ে রাখতে হবে।
স্টুডেন্ট ভিসা (Students Visa)
কোন বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তির যোগ্যতা যাচাই পূর্বক উচ্চ শিক্ষার অনুমতি পেলে ছাত্র-ছাত্রীরা Students Visa পাওয়ার অনুমতি লাভ করে। এই ভিসাকে আমেরিকায় ও -২০, কানাডায় Students Authorization ও অন্যান্য দেশে Students Visa বলে।কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডে ছাত্র-ছাত্রীরা পার্টটাইম কাজ করার অনুমতি পেতে পারে। আর শুধু Graduate Level-এ বৃত্তি পাওয়া যায়। Under Graduate Level-এ সচরাচর কোন বিদেশী ছাত্র/ছাত্রীকে বৃত্তি দেওয়া হয় না। ইউরোপীয়ান দেশগুলোর মধ্যে ফ্রান্সে ছাত্র-ছাত্রীদের কোন টিউশন ফি লাগে না।
স্টুডেন্ট ভিসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্যাবলী:
- আগেই সরাসরি কিংবা এজেন্টের মাধ্যমে নির্বাচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করে ভর্তি ফরম পূরণ ও ভর্তির অনুমোদন সংগ্রহ করতে হয়।
- অনুমোদনপত্র ও বৃত্তিসংক্রান্ত তথ্যাবলীসহ নিকটস্থ দূতাবাস বা হাইকমিশনে যোগাযোগ করতে হয়।
- সন্তোষজনক ভাবে সাক্ষাৎকার পর্ব শেষে ভিসা অনুমোদিত হয়।
- কোন কোন ক্ষেত্রে মেডিক্যাল টেস্ট ও পুলিশ রিপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে।
- ভিসা প্রাপ্ত গ্রাজুয়েট ছাত্র/ছাত্রীর স্ত্রী/ স্বামী (Spouse) ও ছেলেমেয়েরা ভিসা পাবে।
ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক ভ্রমন (Private and Business trip)
ব্যক্তিগত ভ্রমণ ভিসা প্রাপ্তি সংক্রান্ত তথ্যগুলো নিম্নরূপ:কারা পেতে পারেন
- উচ্চ পদস্থ সরকারী বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, পার্লামেন্ট সদস্য, সচিব, মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।
- উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, সামাজিক, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে খ্যাতিমান ব্যক্তি ও সংগঠক প্রমুখ।
- প্রবাসী আত্মীয় স্বজন দ্বারা আমন্ত্রিত এবং স্পন্সরকৃত আপনজন (যেমন: বাবা-মা, ভাই-বোন, ছেলেমেয়ে ইত্যাদি)।
- শিক্ষা সফরে ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং প্রকল্প সম্পর্কিত বিশেষ প্রতিনিধি বা প্রশিক্ষনার্থী।
- বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও (NGO) বা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও বিদেশ ভ্রমনের ভিসা পাওয়া সহজ তবে ঐসব বিষয়ে ভিসা প্রার্থীদের বিশেষ কিছু কৌশলগত প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। যেগুলো নিম্নরূপ:
- সে দেশে কেন যাবেন এবং খরচ কে বহন করবে?
- সে দেশে গিয়ে ফিরে আসবেন তার নিশ্চয়তা কি?
- আগে কখনও সে দেশে বা অন্য কোন দেশে এ ধরনের কাজে গিয়েছেন কি না?
- প্রার্থী প্রকৃতপক্ষে কি পদমর্যাদায় আছেন, তার আয় কত-এ সবকিছুর প্রমান দাখিল করতে হবে।
- প্রার্থীর গাড়ি, বাড়ি, টেলিফোন, মোবাইল, ব্যাংক ব্যালেন্স ইত্যাদি আর্থিক স্বচ্ছলতার স্বচ্ছ বিবরণ দিতে হবে অর্থাৎ ভিসা অফিসারের মনে আস্থা আনতে হবে যে আমার দেশে আমি যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত ও স্বচ্ছল অবস্থায় আছি। কাজেই আপনার দেশে গিয়ে ফিরে না আসার কোন কারণ আমার নেই।

